রশীদ আহমেদ চৌধুরী

দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার নাম। প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’ (Safe Homes for All)। এ বছরের মূল বার্তা স্পষ্ট—নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা দারিদ্র্য বিমোচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও আয়বৈষম্য সেই অর্জনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যখন মানুষকে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, তখন শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়নের সাফল্য বিচার করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা জাতীয় আয়ের অঙ্কে নয়, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বচ্ছল হলো—তার মধ্যে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের Bangladesh Poverty and Equity Assessment অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে একই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমেছে এবং প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় আবার দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল প্রকাশিত হালনাগাদ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১.৪ শতাংশে উঠেছে। এটি ২০২৫ সালের একটি প্রাক্কলন, নতুন জাতীয় খানা জরিপের চূড়ান্ত ফল নয়। বিশ্বব্যাংকের ওই মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।

এই পরিসংখ্যান একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেই দারিদ্র্য কমে না। প্রবৃদ্ধির সুফল যদি কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ানো নয়; মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কার্যকর নিশ্চয়তা তৈরি করা।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ

১. মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট: খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় সমানতালে বাড়ে না। ফলে পরিবারগুলো পুষ্টি, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনেও কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের মূল্যায়নেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মজুরির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করা জরুরি।

২. কর্মসংস্থানের সংকট: কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেলে কিংবা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি না পেলে দারিদ্র্য স্থায়ী রূপ নেয়। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়ন বলছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়ননীতির কেন্দ্রে না রাখলে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

৩. বৈষম্য ও সুশাসনের ঘাটতি: সম্পদ ও সুযোগের অসম বণ্টন, আর্থিক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক সহায়তার দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণ দারিদ্র্য কমানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক পরিবারের অনেকে সামাজিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিল, অথচ সচ্ছল পরিবারেরও একটি অংশ এ সহায়তা পেয়েছে। অর্থাৎ শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুতি: ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় মানুষ জমি, ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার পর্যাপ্ত পুনর্বাসন না পেলে নতুন করে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। জলবায়ু ঝুঁকিকে তাই শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
নিরাপদ বাসস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন
২০২৬ সালের বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে নিরাপদ বাসস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, অনিরাপদ বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বাসস্থান মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। শহরের বস্তিবাসী, ভূমিহীন পরিবার এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সাশ্রয়ী আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপদ বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করা উন্নয়ননীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করে বিকল্প বাসস্থান ও জীবিকার ব্যবস্থা না করলে দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়তে পারে। আবাসন প্রকল্পের সাফল্য শুধু কতটি ঘর নির্মিত হলো তা দিয়ে নয়, কতটি পরিবার নিরাপদে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে, তা দিয়ে বিচার করতে হবে।

বাংলাদেশের করণীয়
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানকে উন্নয়নের প্রধান সূচক করতে হবে। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানসম্মত কাজ সৃষ্টি করতে হবে। তরুণদের প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভাতা ও সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। অপচয়, অনিয়ম ও ভুল উপকারভোগী নির্বাচনের সুযোগ কমাতে স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

চতুর্থত, নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান, মৌলিক সেবা এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে।

পঞ্চমত, জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই অবকাঠামো, বিকল্প জীবিকা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, সুশাসন ও ন্যায্য সুযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো অপরিহার্য।

দারিদ্র্য বিমোচনকে কেবল সরকারি প্রকল্প, ভাতা কিংবা দাতাদের সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, মৌলিক সেবা সহজলভ্য হবে এবং উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও ভোগ করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধিকে ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা। রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজেটে দরিদ্র মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; সামাজিক নিরাপত্তা হতে হবে কার্যকর, বাজারব্যবস্থা হতে হবে জবাবদিহিমূলক এবং উন্নয়ন হতে হবে মানুষকেন্দ্রিক।
দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য কত টাকা ব্যয় হলো, কত প্রকল্প নেওয়া হলো কিংবা প্রবৃদ্ধি কত বাড়ল—শুধু তা দিয়ে মাপা যাবে না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন কোনো মানুষ ক্ষুধার কারণে খাবার, অর্থের অভাবে চিকিৎসা কিংবা অসামর্থ্যের কারণে নিরাপদ বাসস্থান থেকে বঞ্চিত হবে না। বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে বাংলাদেশের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—প্রবৃদ্ধির সুফলকে কাগজের হিসাব থেকে মানুষের বাস্তব জীবনে পৌঁছে দেওয়া।

লেখক – রশীদ আহমেদ চৌধুরী, আয়কর আইনজীবী, সদস্য -চট্টগ্রাম কর আইনজীবী সমিতি